জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬: রাজনীতিতে নারী প্রার্থীর সংকট ও সম্ভাবনা

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬: রাজনীতিতে নারী প্রার্থীর সংকট ও সম্ভাবনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৭৮। পরিসংখ্যানটি প্রথম দৃষ্টিতে খুব বড় না হলেও নারী প্রার্থীদের শিক্ষা, পেশা ও বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে একটি দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একদিকে নারীরা যোগ্যতা ও প্রস্তুতির দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক কাঠামো সেই অগ্রযাত্রাকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছে না।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, নারী প্রার্থীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ উচ্চশিক্ষিত এবং দুই-তৃতীয়াংশ কর্মজীবী। আইন, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও উন্নয়ন খাত থেকে আসা এই নারীরা প্রমাণ করেন যে রাজনীতি আর কেবল উত্তরাধিকার বা প্রতীকী অংশগ্রহণের ক্ষেত্র নয়। তবু মোট প্রার্থীর তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ ৪ শতাংশের নিচে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব ও অগ্রাধিকারের সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংখ্যাগত দিক থেকে এবার নারী প্রার্থীর উপস্থিতি আগের নির্বাচনের তুলনায় কমেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে নারী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি এখনো কাঠামোগত সংস্কারের বদলে পরিস্থিতিনির্ভর সিদ্ধান্তের মধ্যেই আটকে আছে।

রাজনৈতিক দলগুলো ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের প্রস্তাবে নীতিগতভাবে সম্মত হলেও বাস্তবে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অনীহা দেখা গেছে। একাধিক দল এবার কোনো নারী প্রার্থীই দেয়নি।

সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থাকে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিকল্প হিসেবে দেখার প্রবণতা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীরা যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, জবাবদিহি ও নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জন করেন, সংরক্ষিত আসন তা নিশ্চিত করতে পারে না।

ফলে মূল নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ না বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বের ঘাটতি থেকেই যাবে।

তবে ভোটার পর্যায়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। নারী প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন ও আগ্রহ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে পেশিশক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ নারীদের জন্য রাজনীতিকে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এসব বাধা দূর না হলে এই পরিবর্তন টেকসই হবে না।

বয়স ও পেশাগত বৈচিত্র্য দেখায় যে নারী প্রার্থীরা আর কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। তরুণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও প্রবীণ নারীরাও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এটি সম্ভাবনার দিকটি স্পষ্ট করলেও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

সব মিলিয়ে বর্তমান চিত্রটি একটি সংযোগহীনতার কথা বলে। নারীরা রাজনীতিতে আসতে প্রস্তুত, ভোটারদের একটি অংশ তাঁদের গ্রহণ করতেও আগ্রহী। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন, নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের ঘাটতি সেই প্রস্তুতিকে পূর্ণ বাস্তবতায় রূপ নিতে দিচ্ছে না।

এই ব্যবধান দূর করা না গেলে নারী প্রার্থীর যোগ্যতা ও সম্ভাবনা রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থেকেই যাবে, যা গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে দুর্বল করে দেবে।


এইচ. এম. এ. হক মেহমেদ
ফাউন্ডিং ডিরেক্টর

Policy Box
www.policybox.org

Add a Comment

Your email address will not be published.